অতি প্রয়োজনীয় কয়েকটি সাধারণ নিয়মাবলী:-
(১) চাল ( Rice):- খিচুড়ি, পোলাও ও বিরিয়ানীর প্রধান উপাদান হ'ল চাল। এগুলি তৈরিতে আতপ ও সেদ্ধ দুইরকম চালই ব্যবহার করতে পারেন। তবে তা যেন পুরানো, সরু হয় ও ভাঙা না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সাধারণতঃ, এসবের জন্য দেরাদুন আতপ ও সেদ্ধকেই সেরা বলা হয়। ভাঙা চাল ব্যবহার করলে দলা পাকিয়ে যাবে, ঝরঝরে হবে না। কমপক্ষে আধঘন্টা চাল ভিজিয়ে রাখার পরে রান্না করবেন। এতে ভাতগুলি লম্বা লম্বা হবে। প্রথমে চাল ভালোভাবে ঝেড়ে হাতে বেছে নিতে হবে। তারপর আবার চাল ধুয়ে আঁচে বসিয়ে আধসেদ্ধ করে ফ্যানটা ঝরিয়ে পোলাও, বিরিয়ানি, ফ্রায়েড রাইস বা খিচুড়ি রান্না করবেন। আবার আপনার ইচ্ছে হলে চাল ভালোভাবে পরিষ্কার করে ধুয়ে নিয়ে জল ঝরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চড়াতে পারেন। অথবা, ধোয়া চাল মুছে নিয়ে একটি পাত্রে রেখে সামান্য ঘি, নুন, চিনি, জাফরান, রঙ প্রভৃতি মিশিয়ে নিতে পারেন। তবে চেখে দেখে নেবেন নুন-মিষ্টি সমান আছে কিনা! তারপর পরিমাণ মতো আখনি জল মিশিয়ে উনুনের আঁচে বসিয়ে জল মেরে নিয়েও তৈরি করতে পারেন। পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি বা ফ্রায়েড রাইসের সব মশলাগুলি মিহি করে বেটে সামান্য ঘি এবং বাটা মশলা চালে ভালোভাবে মাখিয়েও তাতে পরিমাণ মতো জল দিয়ে রান্না করতে পারেন। এই নিয়মগুলির মধ্যে আপনার সুবিধার নিয়মটি বেছে নেবেন।
(২) আখনির জল:- এবার আসি আখনির প্রসঙ্গে। পরিমাণ মতো জলে মশলা দিয়ে সেদ্ধ করে এটি তৈরি করা হয়। ঠিকমতো তৈরি করতে না পারলে পোলাও বা বিরিয়ানি খুব সুস্বাদু হয় না। গোলমরিচ, গোটা লঙ্কা, গোটা জিরে, সাদা জিরে, সাদা মরিচ, গরমমশলা, ছোলার ডাল, বাটা আদা, তেজপাতা, কাবাবচিনি, জায়ফল, ধনে, রসুন, পেঁয়াজ, জয়িত্রী ইত্যাদি এক টুকরো পাতলা বা আদ্দির কাপড়ে আলগা করে বেঁধে বিরিয়ানি বা পোলাওতে যতটা পরিমাণ জল লাগবে তার আড়াইগুণ জল ( উদাহরণস্বরূপ - দুই লিটার জল লাগলে পাঁচ লিটার জল দিতে হবে। ) একটি পাত্রে দিয়ে তাতে মশলা বাঁধা পুঁটলি জলে ডুবিয়ে ঢাকা দিয়ে ফোটাবেন। ফুটতে ফুটতে জল যখন অর্ধেক হয়ে লালচে রঙের হবে তখন জল নামিয়ে কিছুক্ষণ পরে জল থেকে মশলার পুঁটলি তুলে চেপে জলটা বের করে তুলে নেবেন। এইভাবেই আখনির জল তৈরি করতে হয়। আবার মাংস-গোস্ত আখনি তৈরি করতে হলে মশলার পুঁটলিতে মাংসের টুকরো দিয়ে উপরের পদ্ধতি অনুসারে ফুটিয়ে চেপে জল বের করে নিতে হবে। এই আখনি মাংসের পোলাও বা বিরিয়ানিতে দিলে খুব সুস্বাদু হয়। যেরকম ইচ্ছা হয় করে নিন।
(৩) দমে বসানোর প্রক্রিয়া:- পোলাও বা বিরিয়ানি তৈরি করতে হলে দমে বসাতে হয়। এই কারণে পোলাও বা বিরিয়ানি বেশি সেদ্ধ করা চলবে না। প্রায় সেদ্ধ হয়ে যখন অল্প অল্প জল থাকে তখন আঁচ থেকে নামিয়ে দুইপাশে দুটি ইটের উপর পাত্রটি বসিয়ে মুখ বন্ধ করে চারদিকে মাখা ময়দা দিয়ে ভালোভাবে আটকে পাত্রটির ঢাকার উপর জ্বলন্ত কাঠকয়লা এবং ইটের ফাঁকে জ্বলন্ত কাঠকয়লা দিয়ে ২৫-৩০ মিনিট রাখলেই সুসিদ্ধ হবে আর ঝরঝরেও হবে। ডেকচি বা হাঁড়ির ঢাকনাতে কাঠকয়লা দেবার আগে সামান্য মাটির প্রলেপ লাগিয়ে দিলে ঢাকনিতে দাগ হবে না। যদি ওভেনের ব্যবস্থা থাকে তাহলে ওভেনে পাত্র বসিয়ে দমে বসানো যায়। তবে, অবশ্যই মনে রাখবেন যে দমে বসানোর সময় কাঠকয়লার আঁচ যেন বেশি না হয়। বেশি হলে রান্না পুড়ে যায়। মোটা ডেকচি বা হাঁড়িতে রান্না করবেন।
(৪) রঙ:- একটু খোঁজখবর নিয়ে খুব নামকরা ভালো কোম্পানির রঙ ব্যবহার করবেন। যে কোন বড়ো স্টেশনারি দোকানে গিয়ে ওনাদের বললে না থাকলে ওনারা আনিয়ে দেবেন। যদি জাফরান ব্যবহার করতে চান তাহলে হাফ কাপ গরম দুধে জাফরান ভিজিয়ে কিছুক্ষণ ঢাকা রেখে তারপর ব্যবহার করবেন। পোলাও বা বিরিয়ানি তৈরি হয়ে যাবার পর ঘাঁটাঘাঁটি করা চলবে না। দমে বসানো হয়ে যাবার পর হাঁড়ি বা ডেকচি কাপড় দিয়ে ধরে ঝাঁকিয়ে নেবেন। যদি মাংসের পোলাও বা বিরিয়ানি হয় তাহলে ঝাঁকানোর পরিবর্তে চ্যাপ্টা হাতা দিয়ে উপরের ভাত সরিয়ে তলার মাংসের টুকরো বের করে তারপর পরিবেশন করবেন।
(৫) জল ও ঘি:- পোলাও বা বিরিয়ানি ভালোভাবে রান্না করতে হলে ১ কিলোগ্রাম চালে ৩০০ গ্রাম খাঁটি ঘি লাগবে। আখনি বা জল যেন কমবেশি না হয়। কি ধরনের চাল তা দেখে নিয়ে জল বা আখনির পরিমাণ ঠিক করে নেবেন। আতপ চালের থেকে সেদ্ধ চালে সামান্য বেশি জল বা আখনি লাগে। মোটামুটি ১ কিলো সেদ্ধ চালে দেড় লিটার জল বা আখনি লাগে। আতপ চাল হলে কিছুটা কম লাগে। জলের পরিমাণ বেশি হলে কাদা মতো হয়ে যাবে। যাতে বেশি ঝরঝরে হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আখনির জল কখনও ঠান্ডা ব্যবহার করবেন না। রান্না ভালো করতে গেলে গরম জল ব্যবহার করতে হবে। আঁচে বসিয়ে জল প্রায় শুকিয়ে পোলাও বা বিরিয়ানি রান্না করতে হয়। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে আখনির পুঁটলি ও চাল একসাথে আধসেদ্ধ করে পুঁটলি তুলে জল ঝরিয়ে ডেকচি বা হাঁড়িতে আধসেদ্ধ চাল অন্যান্য উপকরণের সাথে মিলিয়ে ওতে দুধ বা জল অথবা ঘি ছিটিয়ে ১০ - ১৫ মিনিট দমে বসিয়ে রাখবেন। এতে নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে না। যদি মাংসের পোলাও বা বিরিয়ানি রান্না করেন তাহলে মাংসের টুকরোগুলো বেশ বড়ো সাইজের করে কেটে নেবেন। ১ কিলো চালে মাংসের টুকরো হবে ৮ টা। প্রথমে মাংস রান্না করে ডেকচিতে বা হাঁড়িতে রেখে তার উপর আধসেদ্ধ ভাত দিয়ে মশলা, ঘি ছড়িয়ে দিয়ে দমে বসাবেন। দমে বসাবার সময় সুগন্ধি দ্রব্য, গুঁড়ো মশলা, কিসমিস, বাদাম ইত্যাদি দুধে ভিজিয়ে ওতে ছড়িয়ে দিলে সুগন্ধি পোলাও বা বিরিয়ানি তৈরি হবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
মনে রাখবেন: এই ব্লগের কোনও সদস্যই কোনও মন্তব্য পোস্ট করতে পারে৷